সর্বশেষ
আপনারা দেখছেন Insight Narayanganj-এর Beta Version

একটু পেছনে ফেরা যাক; সময়টা ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। ঢাকার বেইলী রোডের একটি বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে ছিলেন ৪৬জন। শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলো গোটা দেশ। সময়ের স্রোতে সেই শোক কেটেছে হয় তো। তবে, চিন্তা বাড়িয়েছে রাজধানী লাগোয়া এই নারায়ণগঞ্জ জেলা শহরের সচেতন মানুষের মাঝে। দেখা দিয়েছে উদ্বেগও। কেননা বেইলী রোডের ওই ভবনের অসংখ্য ‘কার্বন কপি’ রয়েছে নারায়ণগঞ্জের শহরজুড়ে। অট্টালিকায় পরিপূর্ন এই জেলার বহুতল ভবনগুলোতে নেই পর্যাপ্ত ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা। ফলে নারায়ণগঞ্জের কোনো এশটি বহুতল ভবনে আগুনের সূত্রপাত ঘটলে বেইলী রোডের মত এখানেও দেখা যেতে পারে লাশের মিছিল।


জানা গেছে, বেইলী রোডের ওই ভবনে ছিলো একটি প্রসিদ্ধ এক রেস্টুরেন্ট। ওই রেস্টুরেন্টে ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাসের অসংখ্য বোতল মজুদ করে রাখা হয়েছিল ভবনটির সিঁড়ি কোঠায়। এতে বিস্ফোরণ সহ আগুনের ভয়াবহতা বেড়েছে বহুগুণে। ছিলো না কোনো ফায়ার এক্সিটের ব্যবস্থাও।


তথ্য বলছে, সুবিশাল অট্টালিকায় সমৃদ্ধ এই নারায়ণগঞ্জ জেলাতেও এমন বহুতল ভবনগুলোতে ঠাঁই পেয়েছে নামি-দামি অসংখ্য রেস্টুরেন্ট। একই সাথে ভবনগুলোতে নেই ফায়ার এক্সিটের ব্যবস্থাও। এমনকি ফায়ার সেফটি ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয় এখানকার অধিকাংশ বহুতল ভবনগুলোতে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবস্থায় নারায়ণগঞ্জেও যদি কোনো ভবনে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তাহলে বেইলী রোড কিংবা চকবাজারের চুরিহাট্টার মত ভয়াবহতা নেমে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। পরিণত হতে পারে এক এশটি জ্বলন্ত চিতায়।

ইতিমধ্যেই সেই নজির দেখা গেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হাসেম ফুড কারখানায়। যেখানে ফায়ার এক্সিট সহ পর্যান্ত অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে ৫৪জন শ্রমিক। ওই ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস সহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারী সংস্থা তৎপর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ফলপ্রসু কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।


এদিকে, ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১জন প্রাণ হারানোর পর আলোচনায় এসেছিলো নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকাটি। যেখানে প্রায় প্রতিটি ভবনে রয়েছে ক্যামিকেল তথা দাহ্য পদার্থ। ঘিঞ্জি এলাকা এবং দহ্য পদার্থের পল্লী হয়ে উঠায় টানবাজার থেকে ক্যামিকেল গোডাউনগুলো সরিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল হাইকোর্ট। তবে হাইকোর্টের সেই নিদের্শনার প্রতিফলন ঘাঁতে পারেনি নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন। ফলে টানবাজারের কোনো ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে এর ব্যপ্তি ছড়িয়ে পরে ম্যাসাকার হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বোদ্ধা মহল।


যদিও সম্প্রতি ঢাকার বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে টানবাজারের কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে।


সচেতন মহল বলছেন, শিল্প ও বানিজ্যিক নগরী নারায়ণগঞ্জের অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন কিংবা অন্যান্য স্থাপনাগুলোর বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। অন্যথায় শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এই জেলায় ঘটতে পারে ভয়াবহ কোনো দূর্ঘটনা। লিখা হতে পারে নতুন কোনো দুঃসহ ট্র্যাজেডির লোমহর্ষক গল্প। কর্তাব্যক্তিদের নীরবতার কারণে সেই সম্ভাবনাই এখন জোরালো হচ্ছে।


সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শহরে দন্ডায়মান ফজর আলী ট্রেড সেন্টার নামক বহুতল ভবনে রয়েছে গ্রান্ড প্যাসিফিক নামে এক অভিজাত রুফটপ রেস্টুরেন্ট। চাষাড়া শহদ মিনার সংলগ্ন বালুর মাঠ এলাকাতেও রয়েছে এমডি স্কয়ার নামক একটি বহুতল ভবন। ভবনের নীচ থেকে উপর তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরেই বিভিন্ন অভিজাত রেস্টুরেন্ট বিদ্যমান। ছাদেও রয়েছে রুফটপ রেস্টুরেন্ট। দুটি ভবইেন প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষের যাতায়াত রয়েছে। তবে একটি ভবনেও নেই ফায়ার এক্সিটের ব্যবস্থা। এসকল রেস্টুরেন্টের কাজে বোতল গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। এক্ষেত্রে সেখানেও ছোট কোনো অগ্নিকাণ্ড মুহুর্তেই বড় আকার ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


পর্যাপ্ত সেফটি ব্যবস্থা না থাকা সত্বেও এসকল বহুতল ভবনগুলোর অনুমোদন দেয়া নিয়ে রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে। অভিযোগ রয়েছে, আইন না মেনে ভবন গড়ে তোলা হলেও অসাধু কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করেই ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে বহুতল ভবনগুলো।


বেইলি রোডেল ঘটনার পর জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, রাজউক এবং ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ভবনগুলো পরিদর্শন করা হয়েছিল। পরিদর্শনে নানা অসঙ্গতি ধরা পড়লেও কেবল জরিমানা ও সতর্ক করেই দায় সারতে দেখা গিয়েছিল দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বর্তমানে সেই ঝুঁকি নিয়েই ভবনগুলোতে চলছে রেস্টুরেন্টগুলোর জমজমাট ব্যবসা।
তথ্য মতে, শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠা অধিকাংশ কল-কারখানা এবং আবাসিক ও বানিজ্যিক ভবনগুলোতে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। নেই ফায়ার এক্সিটও। জননিরাপত্তাহীন এবং অগ্নিঝুঁকি নিয়েই শহর থেকে শহরতলীতে গড়ে উঠেছে একাধিক বহুতল ভবন। পাশাপশি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, মসজিদ এবং বেশ কয়েকটি মার্কেটও রয়েছে ভয়াবহ ঝুঁকির তালিকায়। তবে তালিকা হলেও এসবের বিরুদ্ধে কার্যকরি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।


ফায়ার সার্ভিসের একটি সূত্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে অগ্নিঝুঁকি ও জননিরাপত্তাহীন বহুতল ভবনের সংখ্যা ১৩৫টি, মার্কেট ৪২টি, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ৭৮টি এবং মসজিদ ১৬৩টি।


অন্যদিকে, ১১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করেছিল রাজউক। আর সিটি কর্পোরেশনের জরিপে ৪২টি পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নিতাইগঞ্জের একটি ঝুঁকিপূর্ণ দোতলা ভবনে বিস্ফোরণের পর তা গুড়িয়ে দিয়েছিল সিটি করপোরেশন। অথচ জননিরাপত্তাহীনতা এবং অগ্নিঝুঁকির তালিকায় থাকা বাকি ভবনগুলোর বিরুদ্ধে এখনো নেয়া হচ্ছে না কোন ব্যবস্থা।


এদিকে, প্রতিটি ঘটনার পরই সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের গাফলতির কথা ভেসে উঠে মোটা দাগে। ২০২১ সালের ৮ জুলাই রূপগঞ্জের হাশেম ফুডে অগ্নিকাণ্ডে ৫৪ জনের প্রাণহানীর পর সেই গাফলতিগুলো উঠে এসেছিল জেলা প্রশাসন গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে।


প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ফায়ার সেফটি ব্যবস্থা না থাকা সত্বেও হাশেম ফুডে দেয়া হয়েছিল বিস্ফোরক ও ফায়ার সেফটির সনদপত্র! এমনকি শিশু শ্রম থাকা সত্বেও কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও সেখানে ছাড়পত্র দিয়ে গেছে বছরের পর বছর। আবার বিল্ডিং কোড না মেনে বহুতল ওই ভবনটি গড়ে তোলা হলেও সেদিকে রহস্যজনক কারণে নজর দেয়নি রাজউক। তা নিয়ে যখন চারিদিকে সমালোচনা চলছিল, তখন নারায়ণগঞ্জে অগ্নিনির্বাপণ ও জননিরাপত্তাহীন বহুতল ভবন এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরী করেছিল নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের তৎকালীন উপ সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন। সেই তালিকাও যেন ডিপ ফ্রিজে বন্দি।


সচেতন মহল বলছেন, বড় কোন ট্র্যাজেডি ঘটার আগেই সরকারের প্রতিটি দায়িত্বশীল দপ্তরকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোর বিষয়ে নজরদারি করতে হবে। অন্যথায় আবারও হাসেম ফুড কিংবা রাজধানীর বেইলী রোড অথবা চুড়িহাট্টার মত ভয়াবহ অগ্নি দূর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায় নারায়ণগঞ্জেও। এমনটা হলে ভবনগুলো পরিণত হবে একেকটি জ্বলন্ত চিতায়। যেকানে হাসেম ফুডের ন্যায় পুড়ে অঙ্গার হতে পারে অসংখ্য প্রাণ। তার আগেই কী ফলপ্রসু কোনো উদ্যোগ নেবে দায়িত্বশীল কর্তরা? সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

শেয়ার করুন