রূপগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-১ আসনটির গুরুত্ব রয়েছে নানা কারণেই। হারানো এই আসনটি পূনরুদ্ধার করতে মরিয়া বিএনপির হাইকমান্ড। তবে আসনটি পূনরুদ্ধারে যাকে বেছে নিয়েছে বিএনপি, সেই প্রার্থীই যেন ধানের শীষ ডোবনোর সকল আয়োজন সেরে রেখেছেন! রূপগঞ্জ তথা নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গণে বিএনপি মনোনিত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপুকে নিয়ে এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বোদ্ধা মহল।
একটি সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা ঘোষণা করার পর সমালোচনার পারদ তুঙ্গে উঠে। তা আঁচ করতে পেরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। ফলে ঘোষিত প্রার্থীর বিষয়ে নিবিড় ভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন তারেক রহমান। এতে বিতর্কের তিলক থাকায় মনোনয়নের চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকা নিয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন দিপু ভূইয়া। কেননা, রূপগঞ্জে বিএনপির জন্য নিবেদিত ও সর্বজন স্বীকৃত একাধিক পরিচ্ছন্ন ও সিনিয়র নেতা রয়েছেন মনোনয়নের তালিকায়। বিপরিতে তার ললাটে রয়েছে বিতর্কের তিলক। ফলে যেকোনো সময়ে তার মনোনয়নের ঘোষনাপত্র বাতিল হতে পারে বলে গুঞ্জন চলছে। বোদ্ধা মহল বলছেন, রূপগঞ্জে বিএনপির হারানো আসনটি পূনরুদ্ধার করতে এর বিকল্পও নেই।
জানা গেছে, রূপগঞ্জ বিএনপিতে যোগ্য, পরিচ্ছন্ন এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবীদ রয়েছেন। এই তালিকায় অন্যতম নাম কাজী মনিরুজ্জামান ও জেলা বিএনপির যুগা¥ আহবায়ক শরীফ আহমেদ টুটুল। তাদের দুজনেরই বিএনপিতে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়কালে দলের জন্য তারা নানা চড়াই-উৎরাই পারি দিয়েছেন। দলের প্রশ্নে তারা যেমন নিবেদিত, তেমনই নেতাকর্মী ছাড়াও রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের যেকোনো বিপদ-আপদেও পাশে থেকেছেন। ফলে রূপগঞ্জে কাজী মনিরুজ্জামান ও শরীফ আহমেদ টুটুলের বিশাল কর্মী বাহিনীর পাশাপাশি তাদের নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিতর্ক না থাকায় তাদের নিয়ে আগামীর স্বপ্ন বুনে ছিলেন রূপগঞ্জবাসী। দলের মনোনয়নের দৌড়ে তারা এগিয়েও ছিলেন। তবে শেষ পর্যায়ে এসে প্রাথমিক তালিকায় তার নাম না আশায় রূপগঞ্জের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, গাজীর শাসনের পর রূপগঞ্জের রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য শরীফ আহমেদ টুটুলই ছিলেন যোগ্য এবং পরিচ্ছন্ন নেতা। রূপগঞ্জে ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সেক্টর দখল ও হানাহানির ঘটনা ঘটলে সেখানে কাজী মনির ও দিপু ভূইয়ার গ্রুপের লোকদের নাম উঠে আসে।
গত ৫ আগস্টের পর রূপগঞ্জের চনপাড়া, মুড়াপাড়া, ভুলতা ও দাউদপুরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে মাদক সহ বিভিন্ন সেক্টর দখলকে কেন্দ্র করে অন্তত ৭টি খুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটি হত্যাকাণ্ডে কাজী মনিরের লোকদের নাম আসলেও বাকি ছয়টি হত্যাকাণ্ডই ঘটিয়েছে দিপু ভূইয়ার অনুসারীরা। তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও অনেকেই এখনো প্রকাশ্যে দিপু ভূইয়ার রাজনীতিতে বিচরণ করে যাচ্ছে। বিপরীতে শরীফ আহমেদ টুটুলের ললাটে এমন কোনো অভিযোগ নেই। তিনি সাধারণ ভোটারদের মাঝে একজন পরিচ্ছন্ন এবং জনবান্ধব নেতা হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে, দিপু ভূইয়ার মত আগ্রাসী ব্যক্তিকে বিএনপির মনোনয়নের প্রাথমিক তালিকায় বেছে নেয়ায় আবারও সেই গাজীর শাসনের পূনরাবৃত্তি ঘটতে পারে এই অঞ্চলে; এমন শঙ্কা জেগেছে দিপু ভূইয়াকে ঘিরে। এই সমীকরণ আগামী নির্বাচনের ফলাফলে ব্যাপক প্রভাব পরার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করতে বিতর্কিত প্রার্থীকে অপসারন ও দলের জন্য নিবেদিত, জনপ্রিয় এবং ক্লিন ইমেজের প্রার্থী বেছে নেয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধা মহল।
উল্লেখ্য, দিপু ভূইয়ার দাদা মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে স্বাধীনতা বিরোধী কট্টর রাজাকার ছিলো। লেখক ও গবেষক মুনতাসির মামুনের বইয়ে এই বিষয়টি উঠে আসে। এছাড়াও ক্ষমতায় আসার আগেই দিপু ভূইয়া সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার মিশনে নেমেছেন বলে স্থানীয় সাধারণ ভোটারদের মাঝে দৃশ্যমান। তবে ঘুরে ফিরে সেই বিতর্কিত ব্যক্তির হাতেই ধানের শীষের প্রতিক তুলে দেয়ায় বিএনপির রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেখানকার ভোটারদের মাঝে।
তরুন ভোটাররা বলছেন, বিএনপিকে কেন্দ্র করে গণঅভ্যুত্থানের যেই স্পিহা বিদ্যমান ছিলো, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে দলটির ঘোষিত দুই প্রার্থীর ক্ষেত্রে সেই স্পিহার পরিপন্থি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী নির্বাচনের ফলাফলে যা বুমেরাং হয়ে উঠবে বিএনপির জন্যেই।
জানা গেছে, মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির প্রভাবশালী এমপি ও মন্ত্রীদের সাথে উঠা-বসা ছিলো তার। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের সাবেক মস্ত্রী ও রূপগঞ্জের সাবেক এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী ছাড়াও সন্ত্রাসীদের গডফাদার তকমা পাওয়া আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান ও তার ভাই জাতীয় পার্টির এমপি সেলিম ওসমানের একান্তই আজ্ঞাবহ ব্যক্তি হলেন দিপু ভূইয়া। তিনি বর্তমানে ওসমান পরিবারের নানা ব্যবসা-বাণিজ্য সহ তাদের জমি ও সম্পদের দেখভাল করছেন। এর মধ্যে ফতুল্লার জামতলা এলাকায় শামীম ওসমানের শাশুড়ির মালিকানা বিশাল জমিতে দিপু ভূইয়া তার ‘গাউছিয়া ডেভেলোপার্স’ নামক রিয়েলস্টেট ব্যবসার অধিনে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও একাধিক জায়গায় তাদের সম্পদ রক্ষা ও বিনির্মানের কাজ চালাচ্ছেন দিপু ভূইয়া। এমন একাধিক তথ্য প্রমাণ হাতে এসেছে।

এছাড়াও আওয়ামী লীগের পতন হলে দিপু ভূইয়া শামীম ওসমানের স্ত্রী ও সন্তানদের নিজ গাড়ীতে করে সিলেটের ডাউকি সীমান্ত পর্যন্ত পৌছে দিয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন, যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে আসে।
উচ্চ পর্যায়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ছিলো শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের নিয়ন্ত্রণে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন হলেও এই সেক্টরগুলো নিজেদের ছায়ায় রাখতে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মডেল মাসুদ ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী দিপু ভূইয়াকে ব্যবহার করেন শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান। ফলে ৫ আগস্ট যখন আওয়ামী লীগের পতন হয়, তখন কোনো ধরনের রেজ্যুলেশন ছাড়াই ব্যবসায়ীদের সংগঠন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাসুদুজ্জামান। পরবর্তীতে মাসুদকে ঘিরে বিতর্ক দেখা দিলে সেখানে ওসমান পরিবারের আরেক বিশ্বস্ত হাতিয়ার দিপু ভূইয়াকে সভাপতি করা হয়। তাদের দুজনের কাঁধে ভর করে নারায়ণগঞ্জে এখনও আওয়ামী লীগ তথা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের অদৃশ্য খবরদারী চলমান রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির রাজনীতিতে একাধিক যোগ্য ও জনপ্রিয় স্বচ্ছ নেতা থাকতেও আওয়ামী লীগ তথা ওসমান পরিবারের হয়ে কাজ করা দিপু ভূইয়ার হাতে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন তুলে দেয়ায় বিএনপি নেতৃবৃন্দ তো বটেই এমনকি সাধারণ ভোটারদের মাঝেও চলছে তুমুল সমালোচনা। আগামী নির্বাচনের ফলাফলে যা বুমেরাং হয়ে উঠবে বিএনপির জন্যেই।





