সর্বশেষ
আপনারা দেখছেন Insight Narayanganj-এর Beta Version

মধ্যরাতে বিএনপি নেতার অফিসে নারী; ৯৯৯ এ ফোন করায় সন্ত্রাসী হামলা!

রাত তখন গভীর হয়েছে। ঘড়ির কাটায় আড়াইটা ছুঁই ছুঁই। লোক চক্ষু এড়িয়ে বিএনপি নেতার ‘সিক্রেট’ অফিসে প্রবেশ করানো হয়েছে এক নারীকে। তবে ঠিক যেন বিধি বাম! স্থানীয় কয়েক জনের চোখে ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। যেমন ভাবা, তেমনই কাজ! বাহির থেকে সেই অফিসের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয় স্থানীয় কয়েকজন। এতে ওই বিএনপি নেতার অফিসে নারী সহ আটকা পড়ে যায় দুজন যুবক। অতঃপর পুলিশের জরুরী সেবা নম্বর ৯৯৯ এ ফোন করেন স্থানীয় কেউ একজন। বিষয়টি জানানোর পর সকালে পুলিশ এসে তালা ভেঙে অবরুদ্ধ হওয়া সেই নারী ও দুই যুবককে উদ্ধার করে। এমন বিপত্তিতে পরায় সেই বিএনপি নেতার কর্মীরা প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালায় স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে। চালায় লুটপাটও। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানাধীন লালখা এলাকায়। হামলার শিকার এক নারী থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও এখনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তুলেছেন। এমনকি বিএনপি নেতার সেই অনুসারীরা পূনরায় দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগী নারীর।

জানা গেছে, ফতুল্লার লালখা এলাকায় অবস্থিত পিটিআই ভবনের পাশে নিজ জায়গায় কারখানা তুলে ভাড়া দিয়েছেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মনির হোসেন। ওই কারখানার দ্বিতীয় তলায় তিনি গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত অফিস। সেই অফিসে রাতভর আড্ডা জমায় তার অনুসারীরা। চলে সিসা সহ অন্যান্য মাদক সেবনও। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক সেবী, হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামী ফয়সাল, আকাশ ও জুয়েলের নিয়মিত আড্ডায় পরিণত হওয়া সেই বিএনপি নেতার অফিসে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ ছিলো শুরু থেকেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ নভেম্বর বিএনপি নেতা মনিরের অফিসে গভীর রাতে এক নারীকে নিয়ে প্রবেশ করে কথিত বিএনপি কর্মী ফয়সাল (৩০) ও তার বন্ধু আকাশ (৩০)। যদিও সেখানে বিএনপি নেতা মনির উপস্থিত ছিলেন না। পরে স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি দেখতে পেয়ে বাহির থেকে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়। ৯৯৯ এ ফোন করার পর সকালে পুলিশ এসে তালা খুলে নারীসহ তাদের দুজনকে ভেতরে পেলেও বিপত্তি এড়াতে ও বিষয়টি ভিন্ন দিকে ধাবিত করতে ওই নারীকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয় আকাশ। তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ দায়ের করতে কেউ সাহস না করায় বিষয়টি স্থানীয় ভাবে সমাধানের কথা জানান থানা থেকে আসা পুলিশ সদস্যরা।

তবে এমন বিপত্তিকর অবস্থায় পরে প্রতিশোধ নিতে ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় লালখা এলাকার জনৈক হালিমের বসত বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা চালায় কথিত বিএনপি কর্মী ফয়সাল, আকাশ, জুয়েল ও তাদের সহযোগিরা।

এই ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন হামলার শিকার হালিমের ভুক্তভোগী স্ত্রী নিলুফা আক্তার (৩৩)। থানায় দায়েরকৃত অভিযোগে লালখা এলাকার বিতর্কিত বিএনপি নেতা আনোয়ার মাস্টারের ছেলে সন্ত্রাসী ফয়সাল (৩০), ফয়সালের বন্ধু আকাশ (৩০) ও জুয়েল (৪০), আনোয়ার মাস্টারের আরও দুই ছেলে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও ১৬টি মামলার আসামী হৃদয় (২৬) এবং সৌরভ (১৯), বিলায়েত হোসেনের ছেলে জাহিদ (২৭) ও একই এলাকার সিয়াম (১৮) সহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, অভিযুক্তদের নেতৃত্বে একদল দেশীয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী নিলুফা আক্তারের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়।

অভিযোগে নিলুফা আক্তার উল্লেখ করেন, হামলাকারীরা বিএনপি নেতার লোক পরিচয় দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্রসহ তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং বিএনপি নেতার অফিসে বাহির থেকে তালা লাগিয়ে দেয়ার ঘটনায় তাদেরকে অভিযুক্ত করে হামলা চালায়। এসময় হামলাকারীরা নিলুফা আক্তারের শ্লিলতাহানী সহ তার স্বামী হালিমকে ধারালো অস্ত্র দ্বারা জিম্মি করে মারধর করে। অতঃপর তারা ঘরের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাংচুর করা সহ বাড়ী নির্মান কাজের জন্য রাখা ২ লাখ টাকা মূল্যবান স্বর্নালংকার লুট করে নিয়ে যায়।

হামলার শিকার নিলুফা আক্তার বলেন, ‘থানায় অভিযোদ দায়ের করার পর অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা ফতুল্লা মডেল থানার এসআই ইয়াসিন আরাফাত ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। তিনি তদন্ত করেছেন। ঘটনার সত্যতাও পেয়েছেন। বলেছিলেন মামলা গ্রহণ করবেন। কিন্তু দুদিন অতিবাহিত হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। উল্টো পুলিশ আশায় পরদিন ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসীরা পূনরায় দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে। তারা হুমকি দিয়ে বলেছে, থানা পুলিশ নাকি তাদের কিছুই করতে পারবে না। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে আমাদের পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে বলেও হুমকি দিয়ে গেছে। এখন আমি সহ আমার স্বামী ও আত্মীয়-স্বজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি আইনের আশ্রয় চাই। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চাই। তারা এলাকায় মাদক কারবারি সহ নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। তাদের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের শান্তি ভঙ্গ হচ্ছে। তারা আগে আওয়ামী লীগের পরিচয় দিত, এখন বিএনপি নেতাদের পরিচয় দিচ্ছে। তাদেরকে আইনের আওতায় না নিলে তাদের নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাবে।’

জানতে চাইলে অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা ফতুল্লা মডেল থানার এসআই ইয়াসিন আরাফাত বলেন, ‘স্থানীয় বিএনপি নেতার অফিসে রাতে এক নারী নিয়ে প্রবেশ করার ঘটনা দেখতে পেয়ে কয়েকজন বাহির থেকে গেইটে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল। পরে ভেতরে থাকা লোক জানিয়েছে যে, সেই নারী তার স্ত্রী। এই তালা লাগানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে একপক্ষ হামলা চালিয়েছে। এটা সত্য। তবে জানতে পেরেছি যে, তাদের মধ্যে আগে থেকেই বিভিন্ন কারণে বিবাদ চলছিল। এই ঘটনায় থানায় অভিযোগ নেয়া হয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় ভাবে সমাধান করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। তো বাদীকে (নিলুফা আক্তার) বলা হয়েছে যে, সে যদি মামলা দায়ের করতে চায়, তাহলে থানায় আসতে। কিন্তু সে থানায় আসেনি। মামলা দায়ের করার মত ঘটনা ঘটেছে। যদি মামলা দায়ের করতে চায়, তাহলে আমরা মামলা নিব।’

শেয়ার করুন