সোনারগাঁয়ে বিএনপির রাজনীতিকে নিজের চার দেয়ালে বন্দি করেছেন মান্নান; এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে এ-কথাও ঠিক যে, রাজনীতিতে তিনি দু’হাতে টাকা ঢেলে গেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই টাকার শক্তিতেই স্থানীয় বিএনপিতে ছড়ি ঘুড়িয়ে চলা মান্নান এখন সর্বে সর্বা হয়ে উঠেছেন বটে, প্রখ্যান্তরে নেতৃত্বগুণ কিংবা অন্যান্য যোগ্যতার বিচারে যে তিনি বরাবরই অনুত্তীর্ন; তা অস্বীকার করার সাধ্য কার!
সে যাই হোক, অর্থের বিচারে উত্তীর্ন বলে বিবেচনার তালিকায় রাখা এই বিএনপি নেতাকে নিয়ে বেজায় বিপত্তি দেখা দিয়েছে দলীয় অঙ্গনে। তা অবশ্য হবারই কথা! কেননা, একদিকে তার নেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা; তার উপর নেই সাবলিল ভাবে বক্তব্য দেয়ার সাধারণ গুনটুকু। আচার-আচরণেও কর্কশ স্বভাবের পাশাপাশি অর্থের গরিমা প্রকাশ পায় কথায় কথায়। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, নিজের কর্মীদের সাথেও দূর্ব্যবহার করা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তার। এতে তার পাশের চেয়ারে বসা ব্যক্তিটিও নাকি ভেতরে ভেতরে বেজায় অসন্তুষ্ঠ মান্নানের প্রতি। এমনটা জানিয়েছে সূত্রগুলো।
রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, হালের রাজনীতি চর্চায় শিক্ষা-দীক্ষার কদর যেখানে বেড়ছে; সেকেলে ভাবনা পেছনে ফেলে যেখানে ‘ঘড়ির কাটা’ গড়িয়েছে বহুদূর, নতুন দিনের বার্তা নিয়ে যেখানে ‘সংসদের দেয়ালে আঁকা হয়েছে’ প্রতিশ্রুতির অজস্র দেয়ালিকা, সেখানে নূন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা স্বাক্ষর-জ্ঞ্যানহীন এই মান্নান যে এখন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে বড্ড বেমানান। যোগ্যতার মানদণ্ডে অযোগ্য এই প্রার্থীকে নিয়ে যেন ‘নাক-কাটা’ যাচ্ছে বিএনপির নীতি-নির্ধারকদেরই।
প্রশ্ন উঠেছে, সচেতন মহল থেকে উঠে আসা এমন ক্ষুর-ধার সমালোচনাগুলো কী দায়িত্বশীল নেতাদের কানে পৌঁছেছে আজও? নাকি তা আটকে গেছে রহস্যের কোনো দেয়ালে? এমন সমালোচনাও ভেসে আসছে সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ তথা এই জেলার বিভিন্ন মহল থেকে।
জানা গেছে, নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপর ছড়ি ঘুড়িয়ে চলা মান্নান একটি অংশকে বশে এনেছেন বটে, প্রখ্যান্তরে আরেকটি বৃহৎ অংশকে দাঁড় করিয়েছেন নিজ প্রতিপক্ষের ভূমিকায়।
যোগ্যতার বিচারে পিছিয়ে থাকা এই মান্নানকে যদি দলের চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবেই বেছে নেয়া হয়, তাহলে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ধানের শীষের পতন ঘটতে পারে- এমন শঙ্কা থেকেই যোগ্যতার বিচারে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করার আহবান জানিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে চিঠি দিয়েছেন আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাত প্রার্থী।
চিঠিতে তারা উল্লেখ করেছেন, যোগ্যতার বিচারে তাদের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে বেছে নিলে সেই প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করবেন তারা।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া আজহারুল ইসলাম মান্নান দলের কেন্দ্রীয় ও সিনিয়র নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অশ্লীল বক্তব্য, সাধারণ জনগনের সাথে অশালীন আচরণসহ চাঁদাবাজির কারণে সমালোচিত হয়েছেন। মান্নানকে ঘিরে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে সর্ব মহলে।
বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মান্নান এবং তার পুত্র যুবদল নেতা সজীবের বিরুদ্ধে সীমাহীন দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে আসে। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্কিত এবং অশালীন বক্তব্য দেওয়ায় মান্নানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ফলে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেলেও বেকায়দায় রয়েছেন তিনি।
তাই আসনটিতে ধানের শীষ বাঁচাতে একজন শিক্ষিত, মার্জিত, সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান সম্পন্ন, বিতর্কহীন, জনসম্পৃক্ত, কর্মীবান্ধব, অভিজ্ঞ এবং যোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়- এমন ব্যক্তিকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়ে ইতিমধ্যেই মানববন্ধন করেছেন বিএনপির তৃণমূল ও সাধারণ কর্মী সমর্থকরা। অন্যথায় আসন্ন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিজয় লাভ করা অসম্ভব বলে মনে করছেন বোদ্ধা মহল।
প্রসঙ্গত, তৃণমূলের দাবির প্রেক্ষিতে আজহারুল ইসলাম মান্নানের মনোনয়ন বাতিলের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী সাত বিএনপি নেতা। তারা সবাই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য লিখিত আবেদন করেছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের আবেদনে প্রথমেই স্বাক্ষর করেছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোঃ রেজাউল করিম, এরপর সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ওয়ালিউর রহমান আপেল, সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি খন্দকার আবু জাফর, স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ সভাপতি অধ্যাপক ওয়াহিদ বিন ইমতিয়াজ বকুল এবং সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপির ১নং সহ-সভাপতি আল মুজাহিদ মল্লিক স্বাক্ষর করেন।




