ত্যাগ বড়? নাকি টাকা? স্বরল উত্তরে হয়তো ত্যাগ শব্দটিই বেছে নিবেন দার্শনিকরা। তবে রাজনীতির মাঠে সেই উত্তর যেন বড্ড বেমানান! অন্তত নারায়ণগঞ্জের বিএনপি অঙ্গন তো সে কথাই বলছে নীরবে। নাহ..! ঠিক নীরবেও না; মাঠের রাজনীতি আকড়ে ধরে থাকা তৃণমূল কর্মীদের মুখে এমন বেরসিক উত্তর ভেসে আসছে বেশ জোরে শোরেই। সেই আওয়াজ কী স্পর্শ করতে পেরেছে বিএনপির নীতি নির্ধারকদের? নাকি টাকার দেয়ালেই চাপা পরে গেছে ত্যাগের আর্তনাদ? এমন প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে ৪টিতে দলীয় প্রার্থীদের প্রাথমিক ও সম্ভাব্য তালিকা ঘোষণা করেছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঘোষিত এই সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় জায়গা হয়নি দুঃসময়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির চালিকা শক্তি হিসেবে রাজপথে অবদান রেখে যাওয়া ত্যাগী ও পোড় খাওয়া নেতাদের। এই তালিকায় অন্যতম হলেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গিয়াসউদ্দিন এবং মহানগর বিএনপির আহবায়ক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।

দুজনেই দুঃসময়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে সংগঠিত করার পাশাপাশি ‘ফটোসেশনের রাজনীতি’র ইতি ঘটিয়ে নেতাকর্মীদের রাজপথ মুখি করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সময়কাল থেকে তাদের নেতৃত্বেই রাজপথে আন্দোলনের ফোয়ারা তুলেছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর মাশুলও দিয়েছেন দুজন। রাজপথে শ্রম-ঘামের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের নিয়ে নিজেদের রক্ত ঝড়িয়েছেন; সয়ে গেছেন জেল-জুলুম সহ ওসমান পরিবার তথা আওয়ামী লীগের নির্যাতনের খরগ। কেবল ব্যক্তিগত ভাবেই নয় বরং পারিবারের সদস্যদের উপরেও বয়ে গেছে নির্যাতনের ঝড়। এরপরও রাজপথ কামড়ে ধরে রেখেছেন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির দুঃসময়ের কাণ্ডারী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করা গিয়াস উদ্দিন ও সাখাওয়াত হোসেন খান। তাদের যোগ্য নেতৃত্বে তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও রাজপথে প্রাণশক্তি পেয়েছিলেন।
ফলে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তথা গণঅভ্যুত্থানে তাদের নেতৃত্বে রাজপথের আন্দোলন সফল করেছিলেন দলের কর্মী সমর্থকরা। যাদের ঘাড়ে ভর করে দুর্দিন কাটিয়ে সুদিনের হাতছানি পেয়েছে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি; সেই তাদেরই যেন উপেক্ষা করলেন দলের মনোনয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
রাজনীতির উত্তপ্ত পথে শ্রমে-ঘামে ও প্রবল ত্যাগ-তিতিক্ষায় গড়ে তোলা বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে নিজেদের যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও স্বচ্ছতার স্বাক্ষর রেখে গেলেও এসবের কিছুই যেন তোলা হয়নি মনোনয়নের দাঁড়িপাল্লায়। ফলে আশাহত ও ক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মীরা বলছেন, নীতি-নির্ধারকদের দাঁড়িপাল্লায় ত্যাগের চেয়ে যেন টাকার ভারই তোলা হয়ে ছিলো বেশি।
তাই তো নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ক্যান্টনম্যান্ট খ্যাত ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ লোক হওয়া সত্বেও ‘কাল’ বিএনপিতে যোগ দিয়ে আজই বাগিয়ে নিতে পেরেছেন ধানের শীষের প্রতীক। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সম্ভাব্য প্রাথমিক তালিকায় নাম ঘোষণা করা আলোচিত-সমালোচিত ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান ওরফে মডেল মাসুদকে নিয়ে এমন উদাহরণই টানছেন বিএনপির পোড় খাওয়া কর্মী-সমর্থকরা।
তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে টাকার খেলা চলছে। এখানে ত্যাগের কোনো কদর নেই। ত্যাগী নেতাকর্মীরা মূল্যায়িত হচ্ছেন না। গত ১৬ বছর যারা সরকারি দলের সাথে আঁতাত করে আয়েশী জীবন যাপন করেছেন, তাদেরকেই আনা হচ্ছে সামনের সাড়িতে। করা হচ্ছে মূল্যায়নও। আর ত্যাগী ও রাজপথের সাহসী নেতৃবৃন্দকে রাখা হচ্ছে মাইনাস ফর্মূলায়।

মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের বিশেষ জনপ্রিয়তা রয়েছে নারায়ণগঞ্জে। বিশাল কর্মী বাহিনীর পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততার দরুণ রয়েছে ব্যক্তিগত ভোট ব্যাংক। ফলে মূলধারার রাজনীতিতে থাকা বিএনপির কর্মী সমর্থকরা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাদের দেখতে চান। তবে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণায় মাঠ পর্যায়ের কর্মী সমর্থকদের সেই যৌক্তিক প্রত্যাশার মূল্যায়ন করা হয়নি। স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থাকালে আওয়ামী লীগের এমপি মন্ত্রীদের সাথে মিলেমিশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়া শিল্পপতি ও গা বাঁচিয়ে পর্দার আড়ালের রাজনীতি করা ব্যক্তিদের বেছে নিয়েছেন বিএনপির মনোনয়ন বোর্ড। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন দলের ত্যাগী ও পোড় খাওয়া নেতাকর্মীরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির নীতি নির্ধারকদের এই নীতি-ই আগামীতে কাল হতে পারে গোটা দলের জন্যেই। সু-সময়ের বাতাস শেষে আগামীতে দুর্দিনের আভাস পরতেই রাজপথের জন্য লড়ে যাওয়া ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঙ্কটও দেখা দিতে পারে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে। ফলে দলের কল্যাণেই যোগ্যতার ভিত্তিতে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতৃবৃন্দকে মূল্যায়ন তথা দলের প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয়াটা এখন সময়ের দাবি।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির মাঠ পর্যায়ের ত্যাগী ও প্রবীন নেতাকর্মীরা নিজেদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলছেন, টাকার দেয়াল ভেঙে যদি ত্যাগ, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করে বিএনপির হাইকমান্ড, তাহলে সেই তালিকায় থাকবে নিঃসন্দেহে জায়গা করে নিতে পারেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন এবং নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক আলোচিত আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান।
তবে শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটবে বিএনপির হাই কমান্ড তা দেখতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন বিএনপির ত্যাগী ও পোড় খাওয়া কর্মী-সমর্থকরা।





