প্রাচীনকালে অপরাধীদের কান কেটে দেয়ার এক প্রথা ছিলো; যাতে সমাজে তাদের চিহ্নিত করা যায়। সেই থেকেই বাংলা বাগধারায় ‘কানকাটা’ শব্দেরও প্রচলন ঘটেছিল। মূলত ‘নির্লজ্জ’ বা ‘বেহায়া’ বুঝাতে এই বাগধারাটি লোকো-কথায় পরিণত হয়। এবার নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতেও যেন সেই ‘কানকাটা চরিত্রের’ এক ব্যক্তির উদয় ঘটেছে। যিনি যুবলীগ নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে দাপিয়ে বেড়ালেও ইদানিং বিএনপির মুখোশ লাগিয়ে হাঁটছেন। নিজেকে আলোচিত বিএনপি নেতা জাকির খানের লোক পরিচয় দিয়ে নতুন করে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছেন। সুবিধাবাদী এই বহুরুপি চরিত্রের সেই ব্যক্তির নাম ফারুক আহমেদ রিপন। লোকে তাকে চেনেন সেমাই রিপন নামে। যুবলীগের এই চিহ্নিত ক্যাডার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে বলে সদর, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রুজু হয়। এসকল মামলায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগও করে রিপন। তবে জামিনে বের হয়ে বিএনপি নেতা জাকির খানকে ফুল দিয়ে তার লোক বনে যান।
অভিযোগ রয়েছে, জাকির খানের নাম ভাঙ্গিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৮নং ওয়ার্ডের শহীদনগর সহ আশপাশের এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে রিপন। এমনকি রয়েছে ভূমিদস্যুতার অভিযোগও। ১৮নং ওয়ার্ডের লুইয়ার মাঠের জায়গায় প্রকাশ্যে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে রিপন। তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও ভূমিদস্যুতার অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সময়কালে যুবলীগ ক্যাডার হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর দাপিয়ে বেড়ানো রিপন স্থানীয়দের কাছে ‘ভূমিদস্যু’ বলে পরিচিত।
জানা গেছে, নিজ কারখানায় ভেজাল সেমাই তৈরী করে ভ্রাম্যমান আদালতের হাতে পাকড়াও হওয়ার পর তার নামের সাথে ভেজাল রিপন টাইটেলও জুড়ে দিয়েছে এলাকাবাসী। লোকে তাকে সেমাই রিপন নামেও জানেন। পুরোদস্তর আওয়ামী লীগার হলেও তার ভূমিদস্যুতা সহ অপরাধ কর্ম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে এখন জাকির খানের কাঁধে ভর করে নিজেকে বিএনপি ঘরনার হিসেবে প্রতীয়মান করার চেষ্টা করছেন। তার এই সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভী চরিত্র নিয়ে এলাকায় তোলপাড় চলছে। স্থানীয়দের অনেকেই তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করলেও জাকির খানের ভয়ে তাকে প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস করেন না।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের হয়ে ছাত্র-জনতার উপর হামলা চালানো এই যুবলীগ ক্যাডারকে বিএনপির আলোচিত নেতা জাকির খান শেল্টার দিয়ে যাচ্ছেন- এমন খবরে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র সমালোচনা চলছে। অনেকে জাকির খানকেও প্রশ্নের কাঠগড়ায় দার করাচ্ছেন। এই বিষয়ে জানতে গতকাল বিএনপি নেতা জাকির খানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। তাই জাকির খানের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে এই সেমাই রিপন ছিলেন শহীদনগর ও আশপাশের এলাকার ত্রাস। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় কতিপয় নেতার সাথে সখ্যতা গড়ে বিগত সময়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞ্যান করে চলতেন।
এছাড়াও, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নিজ অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রচার করিয়ে হেনস্থা করতেন বলেও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। এলাকায় মামলাবাজ হিসেবে কুখ্যাতি রয়েছে রিপনের। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানী করে বেড়ানো তার নেশায় পরিণত হয়েছিল। এমনকি নিজ শ্বশুরের জমি দখলকে কেন্দ্র করে শ্বশুরের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজীর মামলা দিয়েছিলেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ফারুক হোসেন রিপন সৈয়দপুর এলাকার চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানের পুত্র। তিনি নিজেকে কখনো সাংবাদিক, কখনো মেয়র আইভীর লোক আবার কখনো ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে শহীদনগর, সুকুমপট্টি ও সৈয়দপুর এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে আসছিল।
আওয়ামী লীগের পতনের পর ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর মন্ডলপাড়া এলাকা থেকে রিপনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে একাধিক হত্যা, ভূমিদস্যুতা, প্রতারণা ও বিভিন্ন অপরাধে দায়ের হওয়া বেশ কয়েকটি মামলায় তাকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। দীর্ঘদিন জেল খেটে বের হয়েই লেবাস পাল্টে ফেলেন রিপন। ভূমিদস্যুতা চালিয়ে যেতে ভর করেন বিএনপি নেতা জাকির খানের কাধে। এ নিয়েই চারিদিকে চলছে সমালোচনার ঝড়। সেমাই রিপনকে কেন্দ্র করে সমালোচনা চলছে জাকির খানকে নিয়েও।





