মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা অফিস থেকে প্রায় ৯ মাইল দূরত্বে আদমপুর ইউনিয়নের বিশাল এক বনভূমি, যা এই এলাকার সাধারণ মানুষ ছাড়া অনেকেই অবগত নন। আমি ওই এলাকার সন্তান, তা ছাড়া লাউয়াছড়া, সাতছড়ি, রেমা কালেংগা, চুনুতি ইত্যাদি বনগুলোয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে বন সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করি। পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে জানার এ বিষয়গুলো এখানে তুলে ধরছি।
রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্ট রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি বনভূমি। যা ১৯২৭’র ফরেস্ট আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। যে ভূমিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আইনগত সুরক্ষা দেওয়া হয় এবং এতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা নিষেধ থাকে। সরকার কর্তৃক এই বনভূমিকে পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বনের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি করা হচ্ছে প্রধান কাজ। এর আওতায় কয়েকটি ভিট রয়েছে তার মধ্যে আদমপুর ভিট, কুরমা ভিট এবং কামারছড়া। এই বনটি ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত হয়। যেহেতু সংরক্ষিত বা রিজার্ভ ফরেস্ট, তাই একে নিয়ে কেউ কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে শুনিনি।

রাজকান্দি বনের আয়তন প্রায় ১৩০৮০ একর। একে আদমপুর বিটও বলা হয়ে থাকে। এর বাফার জোনে বেশ কয়েকটি গ্রাম রয়েছে। যেখানে মণিপুরী, গারো, খাসিয়া, বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে। এদের অধিকাংশ মানুষ শ্রমিক শ্রেণিভুক্ত এবং তাদের জীবিকা পার্শ্ববর্তী বনের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। গ্রামগুলো হলোÑ কোনাগাঁও, কাওয়ারগলা, আদখানি, জালালপুর, কাটলকান্দি, কানাইদেশি, নয়াগাঁও, ছয়ঘরি, কালারায়বিল, টিলাবাজার, বাঘাছড়া, কুরমাচাবগান, মকাবিল, সুষমানগর, তইলংবারি টিপরা বস্তি প্রভৃতি। বনের এক পাশে একটি খাসিয়া গ্রাম অবস্থিত। খাসিয়াদের ফরেস্ট ভিলেজার (বনবাসী) বলা হয়ে থাকে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ বন বিভাগের মধ্যে এ ব্যাপারে একটি চুক্তি আছে। তাতে উল্লেখ রয়েছে, তারা ফরেস্টের গাছপালা পাহারা দেবে, বিনিময়ে বনের মধ্যে পান চাষ করবে। তবে বনের ক্ষতি হয়Ñ এমন কোনো কাজ করতে পারবে না। খাসিয়াদের উৎপাদিত পান ইউরোপীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি করা হয়। আদমপুর ভিট অফিসের কাছে বাংলাদেশ বন বিভাগের একটি বাংলো আছে, সেখানে বন বিভাগের বড় কর্তারা ঢাকা থেকে মাঠ পরিদর্শনে এলে রাত্রি যাপন করেন। হাম হাম জলপ্রপাত এই রাজকান্দি সংরক্ষিত বনেই অবস্থিত।
বন বিভাগ এই সংরক্ষিত বনে অঘোষিত কিছু আগরগাছের চারা রোপণ করে, যা বর্তমানে পূর্ণ একটি গাছ হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু বন ভবনের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু কর্মচারীর সহায়তায় আগরগাছ কেটে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
রাজকান্দি ফরেস্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের এক স্বর্গভূমি। এই বনে বিশ্বের ১৮ হাজার ৫০০ প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৩০ প্রজাতির প্রজাপতি দেখতে পাওয়া যায়। বিপন্নপ্রায় রাজকিঙ্কর প্রজাপতি রাজকান্দি বনে দেখা মেলে। এগুলো মধ্যম আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় এক ডানার একপ্রান্ত থেকে অন্য ডানার অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৬৫ থেকে ৭৫ মিলিমিটার। ওপরের দিকটা তামাটে কমলা, সামনের ডানার প্রান্তে অতি সরু কালো রেখা থাকে এবং দুই ডানার ওপরদিকে মাঝ-আঁচলে একটি অনিয়মিত ও একটি বা দুটি ঢেউ খেলানো কালো প্রান্তীয় রেখা থাকে। পেছনের ডানার বাঁয়ের-আঁচলে কালো ফুটকির সারি দেখা যায়। স্ত্রী অপেক্ষাকৃত ফ্যাকাশে কমলা, এর সামনের ডানার শীর্ষের কালো পাড় পুরুষের তুলনায় বেশি চওড়া। পুরুষের ডানার নিচের অংশ ফ্যাকাশে কমলা এবং স্ত্রীরটি ফ্যাকাশে বাদামি কমলা। ধূসর, কালো ও কয়েকটি লাল দাগ ছোপে চিহ্নিত। এটি মূলত পাহাড়ি বনের প্রজাপতি হলেও সমতলেও দেখা মেলে। বনের উন্মুক্ত অংশ বেশি পছন্দ করে। সচরাচর বনপথ ও জলধারার কাছে উড়তে বা বসে থাকতে দেখা যায়। ডানা ঝাপটানোর মতো করে ওড়ে। ফুল পছন্দ করে, ভিজা মাটির রসও চোষে। তবে বাংলাদেশ বন বিভাগের এই প্রজাপতির পোষক গাছ সম্পর্কে তথ্যের অভাব রয়েছে। তবে সিঙ্গাপুরে সেটুম্পুল ও আলপাইন অ্যালমন্ড গাছে জীবনচক্র সম্পন্ন হয়। পোষক গাছের পাতার নিচদিকে বা কচি অঙ্কুরে এককভাবে ২ থেকে ৩টি ছোট গুচ্ছে ডিম পাড়ে। ফ্যাকাশে সাদাটে থেকে হলদে ডিমগুলো কিছুটা গোলাকার, যার গায়ে চতুর্ভুজ বা ষড়ভুজ আকৃতির অসংখ্য গর্ত থাকে। জীবনচক্র সম্পন্ন হতে ১৭ থেকে ১৮ দিন সময় লাগে।
শকুন, ময়ূর, ফিঙে, টিয়া, শালিক থেকে শুরু করে দুর্লভ পাখি ‘হর্নবিল’ও এখানে দেখা যায়। বানর, মুখপোড়া বানর, উল্লুক, মায়া হরিণ, বন্য শূকর, চশমা হনুমান, মেছো বাঘ ও ভালুক এবং নানা প্রজাতির সরীসৃপ ও কীটপতঙ্গ এই বনে বিচরণ করে। এখানে এখনও প্রায় হারিয়ে যাওয়া ও সংকটাপন্ন প্রজাতির বনছাগল, এশিয়াটিক কালো হরিণ দেখতে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যে কয়েকটি জাতীয় পার্ক সরকার কর্তৃক ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টকে কেন্দ্র করে আরেকটি জাতীয় পার্ক করা যায় কি না তা কর্তৃপক্ষকে ভেবে দেখার পরামর্শ রাখছি।
দুঃখজনক সত্য হলো, বন বিভাগ একটি সম্পদশালী প্রাকৃতিক বনকে নানা জাতীয় অতি দ্রুত ফলনশীল ‘একাশিয়া’ গাছ রোপণ করে এই বনকে একটি টিম্বার উৎপাদনকারী বনে পরিণত করছে। তাদের ধারণা, যখন অতি দ্রুত সময়ে এই গাছগুলো পরিপক্ব হয়ে উঠবে তখন এগুলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দেওয়া যাবে। এই বনের ওপর জীবিকা নির্বাহকারী ‘ফরেস্ট ইউজার’-গণ প্রতিদিন বনে প্রবেশ করবে এবং বন থেকে অবারিতভাবে গাছের শুকনা ডালপালা কেটে নিয়ে যাবে। এবং তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আর্থিক লাভবান হবে।
জানা গেছে, সামাজিক বনায়নের নামে বাফার জোনে বসবাসকারী মানুষ এবং বন বিভাগের মধ্যে ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন জাতের উচ্চফলনশীল গাছের চারা লাগানো হয় এবং যথাসময়ে গাছ কেটে বন বিভাগ এবং বন ব্যবহারকারীদের মধ্যে যথাযথ প্রাপ্য বিতরণ করা হয়। অবাক করা বিষয়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে কী করে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
বহুজাতিক উদ্ভিদের লীলাভূমি হচ্ছে আদমপুর বন। আদমপুর বনে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশও জন্মে। তার মধ্যে মুলি, মিরতিঙ্গা, ডলো, মাকাল, রুপাই জাতের বাঁশ বেশি জন্মে। এই বনে স্থানীয় প্রজাতির মধ্যে শাল, গর্জন, চাম্পা ফ্লাওয়ার, মিনজিরি, ছাও, করই, ঝাউ, জারুল, অলিভ (জলপাই) আম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারি, কারামবলা, এলিফেন্ট আপেল, আগরগাছ, নাগকেশর, দেলনিক্স, রেজিয়া, বম্বাক্স, সেইবা, হিজল, কারিকা, বাজনা, মিমুসপ্স এলেল্গি ইত্যাদি গাছে সমৃদ্ধ।
প্রতিবছর রাজকান্দি ফরেস্ট থেকে উৎপাদিত বাঁশমহাল লিলামে বন বিভাগ বিক্রি করে থাকে। বর্ষাকালে নদীপথে পানির স্রোতের মাধ্যমে বাঁশ পাহাড় থেকে নিচে নামানো হয়। কয়েক বছর আগেও বিসিআইসি পরিচালিত ছাতক পেপার মিল চলত আদমপুর ফরেস্টের বাঁশ দিয়ে। তখন কমলগঞ্জের ভানুগাছে বিসিআইসির একটি আঞ্চলিক অফিস ছিল, সেই অফিস থেকে পাহাড় থেকে ছাতক পেপার মিলে বাঁশ সরবরাহ ও সমন্বয় করা হতো। বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়, কমলগঞ্জের রাজকান্দি বনের অন্তর্গত ৭টি বাঁশমহালের বাঁশ গত এক দশক ধরে নিলামে বিক্রয় করা যাচ্ছে না। ফলে সরকার অনেক টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের সিন্ডিকেট বাঁশমহালের নিলামে বাধার সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় লাখ লাখ টাকার বাঁশ চুরি হয়ে যাচ্ছে এবং তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে বন বিভাগের সঙ্গে কথা বললে তারা বাঁশ পাচার হচ্ছে অস্বীকার করে এবং যে বাঁশ স্থানীয়রা বাসাবাড়ির ব্যবহারের জন্য নিয়ে যায় তখন তাদের কিছুই করার থাকে না বলে জানান।
গাছ ও বাঁশমহাল সমৃদ্ধ কমলগঞ্জের এই অংশে নজর অসাধু বনখেকো চক্রের। বিলুপ্ত বা বিরল প্রজাতির পাশাপাশি মহামূল্যবান পুরনো গাছগুলোই কাটা হচ্ছে বেশি। বন আইনে উল্লেখ আছে সংরক্ষিত বনের ২০ কিলোমিটার এর মধ্যে করাতকল বসানো যাবে না কিন্তু উপজেলার বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ৩২টি করাতকলে নিয়মিতই চলছে বিরল এসব বৃক্ষের নিধন প্রক্রিয়া। ফাঁকি দিয়ে একদল বনদস্যু চক্রটি এসব গাছ কেটে নিয়ে বিক্রি করছে করাতকলগুলোতে।
তা ছাড়া উপজেলার ২২টি চা-বাগানের ছায়াবৃক্ষগুলোও নেওয়া হচ্ছে করাতকলে। একই পরিস্থিতি কামারছড়া ও কুরমা বনবিটের। রাজকান্দি রেঞ্জের তিনটি বিট থেকে প্রতি রাতেই কোনো না কোনোভাবে গাছ ও বাঁশ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এই অভিযোগের সত্যতাও জানা গেছে। উপজেলার উল্লিখিত ৩২টি করাতকলের অর্ধেকেরই বৈধতা নেই। অবৈধ করাতকলগুলো কৌশলে উচ্চ আদালতে রিট করে তাদের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, করাতকলের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, সেখানে সারি সারি স্তূপ করে রাখা আছে আকাশি, মেনজিয়াম কড়ই, গর্গামার, চিকরা শিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাহাড়ি গাছের গুঁড়ি। করাতকলগুলোতে নিয়ে আসা গাছের খণ্ডাংশের মালিকানা সংবলিত রেজিস্টার ব্যবহার করার কথা থাকলেও সেখানে এসবের কিছুই নেই, যা প্রমাণ করে, এসব গাছ বৈধভাবে করাতকলগুলোতে আসেনি।
বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় এবং নৈসর্গিক পরিবেশে অবস্থিত হাম হাম জলপ্রপাত এই রাজকান্দি সংরক্ষিত বনে অবস্থিত, এই জলপ্রপাতটির অস্তিত্ব সম্পর্কে বাংলাদেশ বন বিভাগ তাদের বিভাগীয় ফরেস্ট অফিসার, এ সি এফ, রেঞ্জ অফিসার, ভিট অফিসার, বন গবেষণা কর্মকর্তা কেউ জানতেন না বা তারা এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও কেউ এর অস্তিত্ব সমন্ধে কোনোদিন অবগত হননি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানি ডিপার্টমেন্ট এবং ন্যাশনাল হারবেরিয়াম ঢাকার যৌথ উদ্যোগে ২০১০-২০১৭ সালে একটি ট্যাক্সনমিক্ সার্ভে পরিচালনা করা হয়। সেই সার্ভে থেকে জানা যায়, রাজকান্দি বনে ৫৪৯ প্রজাতির অ্যাঞ্জিওস্পারমিক (যে প্লেন্ট ফুল উৎপাদন করে এবং ফলের ভিতর বীজ বহন করে) প্লেন্ট পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে প্রতিবেদনকৃত ৩৬১১ অ্যাঞ্জিওস্পারমিক প্রজাতির প্ল্যান্ট থেকে ১৫.২০% প্ল্যান্ট রাজকান্দি বনে আছে।
রাজকান্দি সংরক্ষিত বনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে জলবায়ু পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে অবিলম্বে অবৈধ করাতকলগুলোকে চিহ্নিত করে বন্ধ করে দিতে হবে। অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে বনভূমিকে উদ্ধার করতে হবে। বন্যপ্রাণী নিধন যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। কী কারণে বাঁশমহালগুলো নিলাম বন্ধ রয়েছে তা অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যুব সম্প্রদায়কে এই বনের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে হবে এবং বন রক্ষায় এদের কে জড়িত করতে হবে এবং বন পাহারা দেওয়ার জন্য বনপ্রহরী নিয়োগ দিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।





