সর্বশেষ
আপনারা দেখছেন Insight Narayanganj-এর Beta Version

জটিল অংকে খেই হারাচ্ছে মান্নান!

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আজহারুল ইসলাম মান্নানের নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। প্রাথমিক পর্যায়ে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিবেচ্য হলেও যেন স্বস্তি মিলছে না এই বিএনপি নেতা ও তার অনুসারীদের মাঝে। উল্টো রাজনৈতিক শিষ্ঠাচার বর্হিভুত নানা কর্মকাণ্ড ও অদক্ষতার পরিচয় দিয়ে প্রতিনিয়তই জড়িয়ে পড়ছেন একের পর এক বিতর্কে। এসবের বাহিরেও সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁ নিয়ে গঠিত এই আসন ঘিরে মাঠ ও ভোটের নানা হিসেব-নিকেশও জটিল হচ্ছে ক্রমশই। জটিল সেই অংক কষতে গিয়ে যেন খেই হারাতে বসেছেন মান্নান। তার অনুসারীদের মাঝেও তা ফুঁটে উঠেছে স্পষ্ট।

তাই তো গণসংযোগে নেমে নিজ দলের নেতাকর্মীদের কাছে টেনে নেয়ার বিপরীতে উল্টো ঘর-বাড়ি ছাড়া করার হুমকির মত হুমকি দিচ্ছেন মান্নানের স্বজনরা। এতে ভোটারদের সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হচ্ছেন মান্নান। যার নেতিবাচক প্রভাব পরছে বিএনপির ভাবমূর্তিতেও। এছাড়াও তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে মুঠোফোনে এক গণমাধ্যম কর্মীকে বক্তব্য দিতে গিয়েও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও বিএনপির নেতৃবৃন্দের প্রতি ঢালাও ভাবে বেফাঁস মন্তব্য করে সমালোচনার পাত্রে পরিণত হন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এই ধানের শীষের প্রার্থী। সে যাই হোক, নির্বাচনী বৈতরণী পাড় হওয়ার অংক কষতে গিয়ে মান্নানের জটিলতা দেখা দিয়েছে ভিন্ন দিকে।


নারায়ণগঞ্জে মাঠের রাজনীতি প্রত্যক্ষ করা প্রবীন ব্যক্তি ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সিদ্ধিরগঞ্জ তো দূরের কথা ধানের শীষ বাগিয়ে নিয়েও মান্নান তার নিজ উপজেলা সোনারগাঁতেই পড়েছেন মহা-বিপত্তিতে। বিগত দিনে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে নিজ উপজেলায় যেই বলয় কেন্দ্রীক রাজনীতিতে ঝুঁকেছিলেন; সেই বলয়ই এখন কাল হয়েছে তার। উপজেলা বিএনপির সভাপতি হয়েও সোনারগাঁয়ের বিএনপি নেতাকর্মীদের এক সূতোয় না গেঁথে ত্যাগী ও সম্ভাবনাময়ী নেতাদের উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘মাই-ম্যান’ কমিটি। যারা তাকে ‘জ্বি-হুজুর’ ‘জি-হুজুর’ বলে সম্বোধন করেছেন, সেই অনুগত ও ঘরের লোকদের দ্বারা কমিটি সাজিয়ে সোনারগাঁ বিএনপির মূল ধারার রাজনীতিকে নিজ ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রেখেছেন বহুকাল থেকেই।


বিপরিতে যোগ্যতা, শিক্ষা, নেতৃত্বের গুনাবলি, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, জনপ্রিয়তা এবং পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন অভিজ্ঞ বিএনপি নেতাদের কোণঠাসা করার সর্বাত্বক কৌশলই প্রয়োগ করেছেন দিনের পর দিন।


অন্যদিকে ঘরে বানানো কমিটির মধ্য থেকেও দায়িত্বশীল বেশ কয়েকজন প্রবীন নেতাকে প্রকাশ্য সভামঞ্চে লাঞ্ছিত এবং অপমান-অপদস্ত করার মত ন্যাক্কারজনক অতীত রয়েছে তার।


ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এতে মান্নানের পাশের চেয়ারে বসা ব্যক্তিটিও তার প্রতি ভেতরে ভেতরে বেজায় অসন্তুষ্ট। আচার-আচরণে কর্কশ ও উগ্রতার ছাপ লেপ্টে থাকা এই বিএনপি নেতা কখনো বিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা রাখেননি বলে প্রথম ধাপেই তিনি যোগ্যতার মানদণ্ডে ভোটারদের কাছে অনুপযুক্ত হিসেবে গন্য হচ্ছেন।


স্থানীয় ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একদা ক্ষেত-খামারে কাজ করলেও পরবর্তীকালে তার ভাগ্যে যেন জুটেছিল আলাদিনের চেরাগ! দেশের একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নজরে এসে সোনারগাঁয়ের ফসলি জমি ও নানা বিষয় ঘিরে রাতারাতি ভাগ্য বদলে যায় তার। একদা বদলী খাটলেও অঢেল টাকার মালিক বনে যাওয়া এই ব্যক্তি বিএনপির রাজনীতিতে আসেন অন্যের হাত ধরে। অর্থবৃত্তে ফুলে ফেঁপে উঠা সেই মান্নান হয়ে যান সোনারগাঁ উপজেলার চেয়ারম্যান। কেন্দ্রে টাকার ভেলকি দেখানো এই ব্যক্তি অল্প সময়েই অনেকের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন।


পরবর্তিতে কমিটি বাগিয়ে এনে সোনারগাঁ বিএনপির মুকুটবিহীন সম্রাটও বনে যান তিনি। তবে সম্রাজ্যে নিজের একক আধিপত্য বিস্তার তথা কর্তৃত্ব খাটাতে গিয়ে মাইনাস ফর্মূলার রাজনীতিতে হেঁটে চলা মান্নান এখন সোনারগা বিএনপিকে জোড়া লাগাতে পারছেন না। তার গোড়ামি, টাকার অহংকার ও উগ্র আচার-ব্যবহারের কারণে আত্ম-মর্যাদা সম্পন্ন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বৃহৎ একটি অংশ তার সংঘ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।


সেই অংশের নেতাকর্মীরা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং সাবেক এমপি বীরমুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও সোনারগাঁয়ের সাবেক এমপি এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিমের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে কাজ করে যাচ্ছেন।


তারা সোনারগাঁ তথা নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে একজন যোগ্য নেতৃত্বের গুণাবলী ধারন করা মার্জিত, স্বচ্ছ, জনপ্রিয়, পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা সম্পন্ন একজন শিক্ষানুরাগী নেতাকে তাদের অভিভাবক হিসেবে দেখতে চান। এমন গুনাবলি থাকায় নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির বিজ্ঞ ও প্রবীন নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে দেখতে চেয়ে রাজপথে এখনো আশাবাদি এবং ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।


এই আসনে বিএনপি ও অংগ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিশাল একটি অংশ যেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন, সেখানে মান্নান সিদ্ধিরগঞ্জ তো দূরের কথা তার নিজ এলাকা সোনারগাঁয়ের বিএনপি নেতাদেরকেই এক কাতারে দাঁড় করাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এরই মাঝে গত ১০ নভেম্বর বিকেলে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোনারগাঁ বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে বিশাল গাড়ী বহরের মাধ্যমে সিদ্ধিরগঞ্জে আসেন, যেখানে সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা রেজাউল করীমকে ঘটা করে স্বাগত জানান।


এসময় সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউল করীমের পক্ষে নানা শ্লোগাণ ধরেন। তারা গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউলের নেতৃত্বে সুস্থ্যধারার রাজনীতি চর্চায় ঐক্যবদ্ধ আছেন বলেও শ্লোগাণে শ্লোগাণে মুখর হয়ে উঠেন।


এসময় অধ্যাপক রেজাউল করীম বলেন, ‘সময় বদলেছে। এই শিক্ষিত সমাজ ও বর্তমান প্রজন্মের সাথে খাপ খেয়ে এবং সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে হলে অবশ্যই একজন সু-শিক্ষায় শিক্ষিত, মার্জিত এবং যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তির বিকল্প নেই। আমি শিক্ষিত ও মার্জিত মানুষের পাশে আছি। আগামীতেও থাকবো ইনশাআল্লাহ।’


বিশ্লেষকরা বলছেন, গিয়াস উদ্দিনকে ঘিরে রেজাউল করীমের নেতৃত্বে সোনারগাঁ এবং সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপি নেতাদের বৃহৎ একটি অংশের পাশাপাশি এই দুই অঞ্চলের সাধারন ও সচেতন ভোটাররা আগামীর যেই স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন, তা আসনটিতে বিএনপি ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থী মান্নানের জন্য এক জটিলতম অংকে পরিণত হয়েছে। আগামীতে ভোটের এই অংক জটিলতা মান্নানের জন্য বারবে বৈকি কমবে না। ফলে গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউল করিমকে প্রার্থী করা না হলেও তাদের ঐক্যের দরুণ যেই জটিল অংকের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন মান্নান তাতে আদৌ কী উত্তীর্ণ হতে পারবেন তিনি? এমন প্রশ্নই নাকি বড্ড দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মান্নান অনুসারীদের মাঝেও। শেষ পর্যন্ত কী ঘটতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে, তা দেখতে অপাততঃ অপেক্ষার বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন