নারায়ণগঞ্জে ৪টি আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও তুমুল বিতর্ক বেধেছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন নিয়ে। সদর-বন্দর নিয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ন এই আসনটিতে প্রাথমিক পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান ওরফে মডেল মাসুদের নাম ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয় বিতর্ক। ক্ষোভে ফেটে পরেন বিএনপির মাঠ পর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। সদ্য যোগদান করা এই ব্যবসায়ীকে বিএনপির মলাটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবেও আখ্যা দেন অনেকে। আওয়ামী লীগ তথা ওসমান পরিবারের একনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত এই মডেল মাসুদের হাতে ধানের শীষ নিরাপদ নয় বলে মনে করেন স্থানীয় বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারাও। ফলে ধানের শীষ বাঁচাতে বিতর্কিত মডেল মাসুদকে সরিয়ে মাঠের আন্দোলন সংগ্রামে থাকা বিএনপির প্রথিতযশা নেতাদের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে ধানের শীষের দলীয় প্রার্থী হিসেবে বেছে নিতে একাট্টা হয়েছেন মহানগর বিএনপি নেতারা।
জানা গেছে, মহানগর বিএনপির কমিটি নিয়ে শুরুতে বিরোধ থাকলেও বর্তমানে ধানের শীষ বাঁচানোর প্রশ্নে তৃণমূল কর্মীদের দাবির প্রেক্ষিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। মহানগর বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি আবুল কালাম, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু, বিএনপি নেতা আবু জাফর আহমেদ বাবুল, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আবুল কাউসার আশা এবং বিএনপির মূল ধারার নেতাকর্মীরা।
এরই মাঝে তারা তৃণমূলের দাবির প্রেক্ষিতে প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদের মনোনয়ন পরিবর্তনে সংবাদ সম্মেলন করার পাশাপাশি তৃণমূলের আস্থাভাজন কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন।
নেতৃবৃন্দের এই ঐক্যের দরুণ বিতর্কে জড়ানো মডেল মাসুদ ও তার অনুসারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। মাসুদ ও তার অনুসারীরা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে গেলেও ভেতরে ভেতরে মনোনয়ন টিকিয়ে রাখা নিয়েই চরম শঙ্কায় আছেন। ফলে মনোনয়ন পেয়েও স্বস্তিতে নেই মডেল মাসুদ। তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বারে দ্বারে দৌড়-ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও বিশেষ সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গত ৩ নভেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে বিএনপি। এর মধ্যে সদর ও বন্দর থানা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে প্রার্থী করা হয় বিতর্কিত মাসুদুজ্জামান ওরফে মডেল মাসুদকে। মডেল মাসুদ সদ্যই বিএনপিতে যোগদান করেছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগ তথা ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির প্রভাবশালী এমপি ও মন্ত্রীদের সাথে উঠা-বসা ছিলো তার। ওসমান পরিবার সহ আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা এমপি মন্ত্রীদের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রেখে তিনি তার ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ সূত্রে আরও জানা গেছে, সন্ত্রাসীদের গডফাদার তকমা পাওয়া আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের একান্তই আজ্ঞাবহ মডেল মাসুদ বর্তমানে তাদের নানা ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পদের দেখভাল করছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মাসুদুজ্জামান আওয়ামী লীগের তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান, তার বড় ভাই ও জাতীয় পার্টির এমপি সেলিম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নির্বাচনে স্বশরীরে অংশগ্রণ করে ধানের শীষের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে ছিলেন প্রকাশ্যে। এসকল ছবি ও ভিডিও এখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে।
উচ্চ পর্যায়ের একটি বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ছিলো শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের নিয়ন্ত্রণে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন হলেও এই সেক্টরগুলো নিজেদের ছায়ায় রাখতে মডেল মাসুদকে ব্যবহার করেন শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান। ফলে ৫ আগস্ট যখন আওয়ামী লীগের পতন হয়, তখন কোনো ধরনের রেজ্যুলেশন ছাড়াই ব্যবসায়ীদের সংগঠন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মাসুদুজ্জামান ওরফে মডেল মাসুদ। পরবর্তীতে মডেল মাসুদকে ঘিরে বিতর্ক দেখা দিলে সেখান থেকে তিনি সরে দাঁড়ালেও বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে এমপি হওয়ার বিশেষ পরিকল্পা নিয়েছেন। মূলত, মডেল মাসুদের কাঁধে ভর করে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ তথা শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের অদৃশ্য খবরদারী চলমান রাখার কৌশল বলে বিষয়টিকে আখ্যায়িত করে যাচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
বিষয়টি পরিস্কার হয়েছে ওসমান পরিবারের আরেদ দোসর হিসেবে পরিচিত শিল্পপতি মোহাম্মদ আলীকে কেন্দ্র করে। বিগত সময়গুলোতে ওসমান পরিবারের হয়ে কাজ করা মোহাম্মদ আলী প্রকাশ্যে মডেল মাসুদের সভায় অংশ গ্রহণ করেন এবং তাকে সমর্থন জানান। কিং মেকার হিসেবে পরিচিত এই মোহাম্মদ আলী বিগত ১৭ বছর ওসমান পরিবারের প্রতিটি নির্বাচন এবং অন্যান্য বিষয়ের উপদেষ্টার ভূমিকায় ছিলেন। সেই মোহাম্মদ আলী মডেল মাসুদের পাশে দাঁড়ানোর পর মডেল মাসুদের উদ্দেশ্য সব পরিস্কার হয় জনসম্মূখে। সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করতে মোহাম্মদ আলীতে সাথে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন মডেল মাসুদ- এমন অভিযোগ বিএনপির পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাদের।
বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা বলছেন, বিএনপিকে কেন্দ্র করে গণঅভ্যুত্থানের যেই স্পিহা বিদ্যমান ছিলো, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলটির ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থীর ক্ষেত্রে সেই স্পিহার পরিপন্থি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যা আগামী নির্বাচনের ফলাফলে বুমেরাং হয়ে উঠবে বিএনপির জন্যেই।





